
বরিশাল জেলার বগাখালী গ্রামে আমাদের পূর্ব নিবাস। ঠাকুরদা ছিলেন খুব নিষ্ঠাবান মানুষ। আমার বাবা ছিলেন তাঁর একমাত্র সন্তান। অল্প বয়সে ঠাকুরদা মারা যান। পৈত্রিক সম্পদ বলতে ছিল ছয় বিঘা জমি। বাবা পড়াশোনা জানতেন না বলে তাও ধরে রাখতে পারলেন না। খাজনার না দেয়ার দায়ে সব কেড়ে নিয়েছিল মহাজন। ভিটেমাটি হারিয়ে আমাদের ঠাঁই হল ফরিদপুরে মামার বাড়িতে। মা তখন অন্তসত্তা। অক্ষয় তৃতীয়ার পরের দিন আমি ভূমিষ্ট হলাম। তাই বাবা নাম রেখেছিলেন নিমাই। পরবর্তী কালে আমি বেড়ে উঠলাম মামার বাড়িতে। প্রতিমাশিল্পী হিসেবে দাদুর নামডাক ছিল। বাবাও ছিলেন এই কাজে সম পারদর্শী। তাই ছোটবেলা থেকেই বাবা আর দাদুকে দেখে আমিও মাটি নিয়ে খেলতাম। আর এভাবে দেখতে দেখতে কখন যে তাদের সহযোগী হয়ে উঠলাম নিজেও জানি না। হয়তো এটাই পাল বংশের ঐতিহ্য। পুরো গ্রামের লোক দাদুকে একনামে চিনতো। দাদুর সহযোগী হবার সুবাদে বাবারও বেশ নাম ডাক ছিল।
একদিন হঠাৎ করে বাবাকে প্রশ্ন করলাম “আমার শুধু মাটি দিয়ে ঠাকুর বানাই কেন? অন্য কাজও তো করতে পারি? ” বাবা হেসে উত্তর দিলেন “এই সমাজে এক এক জনের কাজ এক এক রকম। ব্রাক্ষনেরা ঠাকুর পূজা করে, জেলেরা মাছ ধরে, ঢাকিরা ঢাক বাজায়। ঠিক তাদেরই মতই আমরাও মাটি দিয়ে ঠাকুর গড়ি।” সেদিন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম এটাই আমাদের বংশ পরম্পরা। আমরা যদি ঠাকুর না বানাই তবে পুজো হবে কী করে! তখন থেকেই মনস্থির করলাম আমিও পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখবো। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার কাজেও সাহায্য করতাম। এ যেন এক অপার আনন্দ।
মনপ্রান দিয়ে ঠাকুর গড়ার কাজ শিখছিলাম। হটাৎ একদিন বাবা আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বুঝলাম এবার আমাকেই সংসারের হাল ধরতে হবে। পড়াশোনায় ইতি টানলাম। মাধ্যমিক পাশ করার আগেই বের হলাম জীবিকার সন্ধানে। মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়া ছিল নেশার মত। তাই এই নেশাকেই পেশা হিসেবে নিলাম। নরেশ কাকার হাত ধরে পাড়ি জমালাম শহরে। শুরু হলো আমার নতুন জীবন। নতুন উদ্দ্যমে প্রতিমালয়ে কাজ শেখা শুরু করলাম। মায়ের মুখে হাসি ফোঁটাতে হাজার কষ্টের মাঝেও দাঁত কামড়ে পড়ে রইলাম। কখনো মাসে বা কখনো এক কালীন মাইনে পেতাম। তা থেকে মাকে কিছু টাকা পাঠাতাম। কোনভাবে কাটছিল আমাদের অভাবের সংসার।

গ্রাম আর শহর যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। সব কিছুর পরেও কেমন যেন একটা অপূর্ণতা রয়ে যায়। গ্রামে ঠাকুর বানাতাম এক আদলে, হয়তো আকৃতি বড়-ছোট হতো তবুও সমতাবিধান ছিল। কিন্তু শহরে প্রতিমায় ছিল ভিন্ন ভিন্ন আদল। এখানে কারিগরেরা প্রতিমা বানায় খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী। এ নিয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে সবকিছুই মেনে নিতে হয়। প্রথমে একটু বেমানান লাগলেও পরে ঠিক সহনীয় হয়ে ওঠে। খদ্দের বাইনা করার পর শুরু হয় কাজের তোড়জোড়। পরিচিতির খাতিরে নাম মাত্র টাকাতে বাইনা হয়। মাটিমাড়ানো, বেনা বাঁধা, মাটির প্রলেপসহ অনেক পরিশ্রমের পর প্রতিমার প্রাথমিক গঠন তৈরি হয়। খদ্দের কিছুদিন পর পর প্রতিমালয়ে এসে নানা চাহিদা ও আবদার করতে থাকে। যেমন-অসুরের হাতে খরগ্ না হয়ে গদা হলে আরো ভালো লাগতো, দূর্গা ঠাকুরের মুখমন্ডল কিন্তু অমুখ অভিনেত্রীর মতো হওয়া চাই, অলংকার টা কিন্তু সোনার মত চকচকে করা চাই, রং টা আরো উজ্বল হলে ভাল হতো। কিন্তু যখনই প্রতিমা নেওয়ার সময় হয়, তখন সবার মুখে যেন এক বিষন্নতা। বেশিরভাগের মুখে একটাই কথা, এবার পূজোর চাঁদা তেমন ওঠে নি। কিছু টাকা কম দিলে কী বা এমন হবে! একজন যদি কিছু কম দেয় তা মেনে নেয়া যায়, কিন্তু দশজনে যদি বাকী টাকা কমিয়ে দিতে চায় তখন আমাদের উপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। তবুও মেনে নেয়া হয় খদ্দেরের সব আবদার। যেন আসছে বছরের কাজটা হাত ছাড়া না হয়। তবে খদ্দেরদের মাঝে অনেকে ব্যতিক্রমও আছেন।ভালোই কাটছিল দিনগুলো। কয়েক বছর যেতেই মায়ের অনুরোধে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হল। বেড়ে গেল দায়িত্ব।
এই পুজোকে ঘিরে কত জল্পনাকল্পনা, কত প্রতিযোগিতা, কত সমালোচনা, কত সম্মাননা। কিন্তু আমরা যথাযথ সন্মানী পাই না। এই বেদনা নতুন নয়। তবুও হাসি মুখে থাকতে চাই, শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে চাই। কিন্তু করোনা মহামারীর এই সংকটময় মুহূর্তে তা কী সম্ভব হবে? ভগবান ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।
ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি থেকে আমাদের কাজ বন্ধ। মহামারির প্রকোপে সবাই ভীত-সংকীর্ণ। কিছু বাসন্তী ঠাকুরের বায়না করে গিয়েছিল। কাজ অর্ধেক হতে না হতেই সরকার লকডাউন জারি করলো। প্রথমে বুঝিনি এই লকডাউনের অর্থ কি। কিন্তু যত দিন গড়িয়েছে ততই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পেরেছি। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে, না হলে বিপদ। কিন্তু জীবিকা না থাকলে জীবনে কষ্টের সীমা থাকে না।
প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তিতে মায়ের জন্য নতুন কাপড় নিয়ে বাড়িতে যেতাম। এই বছর কাপড় তো দূরের কথা অর্থসংকটে ঠিক মত টাকাই পাঠাতে পারি নি। পুরাতন কর্মচারী বলে মালিকপক্ষ কিছু বলতে পারে না। সাত বছর ধরে কাজ করছি বলে মায়া জমে গেছে, তাই তাড়িয়েও দিতে পারছেন না। কিন্তু উনারাই বা আর কতদিন চালাবেন? জমানো যা অর্থ ছিল তাও শেষের পথে। উপার্জন করে চলার মত অন্য কোন কাজ জানা নেই। পুথিগত বিদ্যাও তেমন নেই।
আমাদের প্রতিমালয় দেখে মনে হবে কত কাজ, কত প্রতিমা। কিন্তু কজনেই বা জানে, যে প্রতিমাগুলো ফাল্গুন মাসে বায়না করে রেখে গেছে তা আর নিয়ে যায় নি। পুজোই তো আর হল না। কাকেই বা দোষ দেবো, বুঝাবোই বা কাকে?
এখন কেউ আসে না এখানে। হয়তো কারো মনেই নেই আমাদের কথা। বিপদাপন্ন আজ প্রতিটি মুহুর্ত। অস্তিত্ব রক্ষাই যেন বড় দায়। কেউ কখনো ভাবে নি এমন একটা দিন আসবে। আর আমরা এভাবে অসহায় হয়ে পড়বো। এতদিন কত সংগঠনের নাম শুনেছি। সহযোগীতা তো দূরে থাক, বেচে আছি কিনা তাও কেউ খবর নিলো না। আমরা তো এতদিন সকলের এত আবদার-অনুরোধ কত কিছুই না রাখলাম। আজ আমাদের প্রতি কি একটু দৃষ্টি দেয়া যায় না? এ শিল্পটাকে বাচিয়ে রাখার জন্য কি আমাদের হাতটা ধরা যায় না? যে হাত দিয়ে কাজ করতে শিখেছি, সে হাত পেতে কিছু চাইতে বিবেক যন্ত্রণায় ভুগি।
স্রষ্টার কাছে শুধু একটাই প্রার্থনা, সকল দূর্যোগ অতিক্রান্ত হয়ে পুজোটা আবার শুরু হোক। মা বাসন্তিকে যেন আবার মা দূর্গারুপে মন্ডপে অধিস্থিত করতে পারি।
[ উপরোক্ত গল্পটুকু বহু প্রতিমা শিল্পীর অন্তরের আকুতিকে ছোটগল্পে চিত্রায়িত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস। গল্পটা তাদের জীবন থেকেই সংগ্রহীত। গল্প হলেও প্রতিটি কথাই সত্য। তাদের প্রতি আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। ভেবে দেখুন তো একবার, আজ এই শিল্পীগোষ্ঠী যদি পিছপা হয়, তারা যদি তাদের কর্দমাক্ত হাতটা ধুয়ে পেশা পরিবর্তন করে তবে কী হবে?
তাই আপনার/আমার/আমাদের দায়িত্ব সহযোগীতার মাধ্যমে তাদের শিল্পটাকে বাচিয়ে রাখা। তা না হলে এমন একটা সময় আসবে আমাদের পুষ্পাঞ্জলির পুষ্প ভগবানের চিত্রপটে কিংবা ঘটে নিবেদন করতে হবে। ]
পরিশেষে যার কথা বলে ইতি বাক্য টানতে চাই, তিনি হলেন আমাদের সকলের প্রিয় একজন মানুষ ” গৌঁতম পাল ” দাদা। যার কথা না বললেই অপূর্ণতা রয়ে যাবে অামাদের সম্পূর্ণ কাজাটার মাঝে। যিনি কিছুদিন আগেই ইহলোকের সকল মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেছেন। সকলে প্রার্থনা করবেন, এই মানুষটি যেন ওপারে খুব ভালো থাকে।
চিত্রগ্রাহকঃ Ruhit Chowdhury
নির্দেশনাঃ Kishoresh Bhattacharjee
সহযোগিতাঃ Sourav Das












