করোনায় অক্রান্ত মৃত দেহ সৎকারে এগিয়ে এসেছেন চট্টগ্রামের একদল তরুণ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সুদীপ্ত অাকাশ রাজন

খালের পানিতে হেঁটে লাশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

নিউজ ডেস্ক ঃ Daily local voice

রাত দুটায় হঠাৎ সুমন ভাইয়ের কল।
কসমোপলিটনে একজন করোনা রোগী মারা গেছেন তার দেহ দাহ করতে হবে। তিনি বললেন সকাল ৭টায় রেডি থাকতে। আমার ঘুমাতে ঘুমাতে ৫টা বাজলো। ৬টায় উনি কল্ দিলেন। বললেন বাসার সামনে আসছে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য। আমি ব্রাশ করে কোনো দানা পানি মুখে না দিয়ে বের হয়ে গেলাম। তখন কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে। উনার সাথে গেলাম চট্টগ্রাম মেডিকেল। সেখানে ফর্মালিটিজ সেরে লাশ আর তাদের পরিবার নিয়ে ছুটলাম উত্তর কাট্টলি শ্মশানের দিকে। আমার সহযোদ্ধা ছিলো সুমন ভাই, সুস্ময় এবং রাজিব দাদা। সেখানে শ্মশানের পরিবেশ দেখে চমৎকৃত হলাম। বিশাল এলাকা জুড়ে সবুজ জঙ্গল, একপাশে খাল আর মাঝখানে শ্মশান। শ্মশানে যেতে মাঠ পার হতে হয়।

যায় হউক লাশটা নিয়ে চিতায় উঠায় দিলাম আমরা তিনজন। সুমন ভাই আমাদের ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছিলেন। লাশটা যত্নের সাথে চিতায় উঠিয়ে তার পরিবার দিয়ে দাহ করিয়ে যখন চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন আরো একজন রোগীর করোনা উপসর্গে মৃত্যুর খবর পেলাম। একফোটা পানিও সকালে না পড়ায় কাহিল লাগছিলো। এক থেকে দেড় ঘন্টা বসে রইলাম। খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, ফেসবুকে ঢুকার কোনো সুযোগ নেয়। ঘুম হয়েছে মাত্র এক ঘন্টা। তাও কাউকে বুঝতে দিলাম না। একটু পর সেই লাশকে নিয়ে তাদের পরিবার আসলো এবং আমাদের আরো দু’জন স্বেচ্ছাসেবক আসলেন। কিন্তু এই লাশ নেওয়ার সময় সামনে পরে গেলো বড় বাধা।

তখন পানিতে জোয়ার শুরু হয়েছে। তাই খালের পানি মাটিতে চলে এসেছে। শুধু মাটিতে আসছে বললে ভুল হবে। শ্মশানে যাওয়ার যে রাস্তা সেটাও বলা যায় একটা খালে পরিনত হয়ে গেছে। প্রায় হাঁটু সমান পানি। স্রোতের গতি মোটামুটি ভালো। চিতায় তুলতে পুরো এই জায়গাটা পাড় হতে হবে। এক মিনিট চিন্তা না করে সবাই নেমে পড়লাম পানিতে। মারা যাওয়ার পর মানুষের লাশ অনেক ভারি হয়, তার উপর পানির জোড়, তার উপর ভারি লাশ নিয়ে এক হাঁটু পানিতে হাঁটা। অনেক পিচ্ছিল ছিলো। কেউ সাঁতার জানিনা। কোনো কারনে পা ফসকে গেলে হয়তো মারা যাওয়ার চান্স বেশি। তার উপর থেমে থেমে বৃষ্টি তার উপর বাতাস। খাওয়া হয় নাই, ঘুম হয় নাই আর পানিতে সাপের ভয় তো আছেই। কিন্তু তোয়াক্কা করি নাই কোনো কিছু। পাড় করেই ছাড়লাম লাশটা। বাধা আসছে ঠিকই কিন্তু দমাতে পারে নাই আমাদের। কারন বাধা দেখে দমে যাওয়ার জন্য আসি নাই। আসছি মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। হাসি মুখে মৃত্যুকে বুকে লাগানোর জন্য। যায় হউক লাশটা নিয়ে রাখলাম চিতায়। মানুষটার স্ত্রী আর ছোটভাই অবাক। ছোটভাই পাড় হয়ে আগুন দিলো।

Daily local voice

অনেক ক্লান্ত কিন্তু তাও সার্থক। অবশেষে কাজ সেরে বাসায় আসলাম।
অনেক ক্লান্ত কিন্তু সার্থক।

যেকোনো করোনা রোগীর মৃতদেহের সৎকারের জন্য আমরা প্রস্তুত যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে।

লেখক ঃ রাজবীর অাকাশ

One thought on “করোনায় অক্রান্ত মৃত দেহ সৎকারে এগিয়ে এসেছেন চট্টগ্রামের একদল তরুণ

Comments are closed.