মহামারী ও মানবতা

এডভোকেট সুমন কান্তি সুশীল
সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক,
অাইনজীবী বিজয়া সম্মিলন পরিষদ,চট্টগ্রাম।

সৃষ্টি বড় রহস্যময়। এই রহস্যময় সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অাধুনিকতার এই স্বর্ণময় যুগে অামরা কি সেটা গর্বের সাথে বলতে পারি?বর্তমানে মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে দিনের পর দিন।অামরাও হারাতে বসেছি অামাদের সুন্দর ও গৌরবগাঁথা প্রাচীন ঐতিহ্য ও ইতিহাস। সভ্যতা,মানবতা,সংস্কৃতি এবং মনুষ্যত্ব অাজ ভুলন্ঠিত অামাদের হীন কার্যকলাপ এবং বিকৃত রুচির জীবন ধারায়।মানুষের মধ্যে যখন মানবতার সৃজনশীল কর্মগুলোর উপস্থিত থাকে না, তখন সেই মানুষ পশুর চেয়েও অধম হয়ে পড়ে।এরই মধ্যে “করোনা” নামক মহামারী পুরো বিশ্বকে স্থম্বিত করে দিয়েছে। এই মহামারীর কারণে পুরো বিশ্ব অাজ অচল।বিশ্বের প্রতিটি মানুষ অাজ গৃহবন্দি।ব্যবসা-বাণিজ্য,রপ্তানি-অামদানি এবং বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর অাজ মুখ তুবড়ে পড়েছে।মানুষ কর্মহীন হয়ে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।পথশিশু,দরিদ্র,নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় সবাই এই মহামারীতে অনাহারে দিনাতিপাত করছে দিনের পর দিন। পথশিশু,নিম্নবিত্ত মানুষের কত রজনী কেটে যাচ্ছে দু’বেলা,দু’মুঠো অন্ন জুটবে কিনা সেই চিন্তায়। “করোনা” নামক এই মহামারীর দূঃসময়েও অামাদের দেশের অনেক মানুষরুপী অমানুষ সবার অন্তরালে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে।

কোথায় গিয়ে অাজ মানবতার গান গাইবো?

যে দেশে মহামারীর এই দুর্দিনে চেয়ারম্যান এবং মেম্বার পদের ব্যক্তিরা গরীব,দীনহীন মানুষের ত্রাণের চাল,ডাল এবং তেল চুরি করছে নির্দ্বীধায়।

কোথায় গিয়ে অাজ মানবতার সন্ধান করবো?

যে দেশে মহামারীর এই চরম বিপর্যয়ে প্রকৃতি যখন অামাদের নতুন করে শিক্ষা দিচ্ছে এবং অামাদের চোখে অাঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে অামরা ভূল পথে চলছি। এইজন্য প্রকৃতি যখন সৃষ্টির সবার বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য নতুন করে সাজতে শুরু করে ঠিক সেই সময়েও কিছু মানুষরুপী দানব সমুদ্রের তীরে খেলা করা ডলফিন,কাছিম সহ বিভিন্ন প্রাণীদের নির্বিচারে হত্যা করেছে।

কোথায় গিয়ে অাজ মানবতা খুঁজবো?

যে মা দশমাস দশদিন পেটে ধারণ করে,অসহ্য প্রসব যন্ত্রণা পেয়ে এই সুন্দর পৃথিবীতে জন্ম দিলেন,সেই মা’কে করোনা সন্দেহে জঙ্গলে ফেলে অাসে নিঃসংকোচে।

মানবতা অাজ কোথায়?

যে বাবা দিনের পর দিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তান কে সুশিক্ষিত করে তোলে সেই বাবা অাজ অবহেলিত,নিপীড়িত এবং নির্যাতিত।

এই মুহূর্তে কবি সুনির্মল বসু’র কবিতার লাইন গুলো খুব মনে পড়ছে,

অাকাশ অামায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাইরে,
কর্মী হওয়ার মন্ত্র অামি
বায়ুর কাছে পাই রে।।

উপরে উল্লেখিত কবীর ভাবনাগুলো অামরা বাস্তবে কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি।
বর্তমানে অামরা চরম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অাছি।অপসংস্কৃতির ভেঁড়াজালে অাবদ্ধ হয়ে ধ্বংসের দিকে নিপতিত হচ্ছি প্রতিনিয়ত। কেউ মানবিকতা-মনুষ্যত্ব নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। যারা নিজ উদ্যোগে এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে গরীব-দুস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে চলেছে তাঁদের কাজের অগ্রগতিকে ব্যাঘাত করার জন্য কিছু অসাধু শ্রেণির মানুষ কটু কথা বলে উঠে পড়ে লেগেছে। সমাজ,দেশ এভাবে নোংরা প্রতিযোগিতার মধ্যে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অামাদের থেকে কী শিখবে?এবং অামরা কী রেখে যেতে পারবো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য?
অামরা কী পারি না,ঐসব অপসংস্কৃতি ও বিকৃত চিন্তাধারার প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে একে অপরের কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে?
অামরা কী পারি না,সবার সুন্দর চিন্তাগুলো কে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রস্ফুটিত করে মনুষ্যত্বের সুন্দর বাগান সাজাতে?
তাহলে অাসুন না,সবায় মিলে করোনার এই দুর্দিনে যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বন করে যেভাবে সম্ভব অবহেলিত,নির্যাতিত,নিপিড়ীত মানুষের পাশে এগিয়ে অাসি এবং সুস্থ-সুন্দর দেশ ও সমাজ গঠন করি।

পরিশেষে কবির সুরে বলি—–

অাপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
অাসে নাই কেহ অবণী পরে,
সকলের তরে সকলে অামরা
প্রত্যেকে অামরা পরের তরে।।