
যা দেখছেন তা যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোনো দেশের মরদেহ পরিবহনের চিত্র নয়। করোনায় অাক্রান্ত মৃতদেহ নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের উত্তর কাট্টলীর সনৎ দত্ত মহাশ্মশানে যাওয়ার চিত্র। যেই পথ দিয়ে প্রতিদিন ২/৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মৃতদেহ নিয়ে যেতে হয়।
ভাঙা সড়ক ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিনা পারিশ্রমিক ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই দাহ কাজে যুক্ত তরুণ-যুবকদের পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। এরপরেও থেমে নেই এই স্বেচ্ছাসেবীরা। থেমে নেই তাদের মহৎ কাজ। যেখানে পাড়া-প্রতিবেশী, অাত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে নিজের পরিবারের লোকজন পর্যন্ত করোনার ভয়ে কাছে অাসতে চায় না, সেখানে তারা উঁচু,নিচু,কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক সৎকার করে যাচ্ছেন করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যাক্তিদের।
চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যেসব হিন্দু ধর্মাবলম্বী মৃত্যু বরণ করবেন তাদের দাহ করার জন্য নগরীর উত্তর কাট্টলী সনৎ দত্ত সার্বজনীন মহাশ্মশান টি ঠিক করে দেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এজন্য একটি স্বেচ্ছাসেবক কমিটিও গঠন করে দেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেই কমিটির কারো হদিস মিলে নি। তাদের কোন কার্যক্রম ও চোখে পড়ে নি।
তাই করোনায় আক্রান্তে মৃত ব্যক্তিদের সৎকারে এগিয়ে এসেছে চট্টগ্রামের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ-যুবক। নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করে একটি সংগঠন।তারা তাদের সংগঠনের নাম দিয়েছে করোনা মৃতদেহ সৎকার স্বেচ্ছাসেবক সংঘ চট্টগ্রাম। যেটির প্রধান করা হয়েছে আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জহুরলাল হাজারীকে।
করোনা আক্রান্ত রোগীদের অনেকটা নীরবেই নিজ উদ্যোগে সৎকার করছেন কমিটির সদস্যরা কিন্তু সিটি করপোরেশন কোনো দায়িত্ব পালন করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তারা জানান, নগরীর উত্তর কাট্টলী টোল রোডের পাশে সমুদ্র পাড়ে অবস্থিত এ মহাশ্মশান। কিন্তু এ কাজে নিয়েজিত স্বেচ্ছাসেবকদের মরদেহ নিয়ে যেতে পোহাতে হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। কখনো বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হাটু সমান পানিতে, কখনো জোয়ারের পানিতে সাঁতরিয়ে অাবার কখনো বা কাঁদা মাটি মাড়িয়ে পিপিই পরে যেতে হয় তাদের। অনেক সময় করোনা আক্রান্ত মরদেহ স্ট্রেচার থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রমও হয়।

Daily Local voice
কমিটির আহ্বায়ক সুমন পাল বলেন, আমরা নিজ অবস্থান থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে চট্টগ্রামে যতজন করোনা আক্রান্ত হিন্দু মানুষ মারা যান তাদের সৎকার করি। কাঠ যদি পরিবার থেকে দিতে না পারে আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা করি, আর পরিবার থেকে দিতে পারলে তাদের দেওয়া কাঠেই দাহ করা হয়। সরকারিভাবে এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অামাদের সহায়তা করার কথা থাকলেও সেরকম কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ সুমন পালের।
কমিটির সদস্য অজয় দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে বলুয়ার দীঘির পাড়ে অারো একটি শশ্মান ছিল যেটা হলে অামাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সৎকারকার্য সম্পাদন করতে সুবিধা হতো কিন্তু সেটা ঠিক না করে অজপাড়া গায়ে যেখানে নেই কোন যোগাযোগ ব্যাবস্থা, নেই সৎকার করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সেখানে কেন সিটি করপোরেশন সৎকারের জন্য জায়গা ঠিক করে দিল অামার জানা নেই।
সৎকারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ,কেরোসিন,ধূপ এর সংকট রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি অারো বলেন, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে কাঠ দেয়ার কথা ছিলো,কিন্তুু সেগুলো এখন আমাদের টাকা দিয়ে কিনে নিতে হচ্ছে। এরপর চুলার সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে ১/২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে তা দিয়ে একটি চুলাতে হয়ে যাচ্ছে,কিন্তুু সামনে আরো ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে।তখন যদি একসাথে ৬/৭ টা লাশ আসে,তখন তা শবদাহ করতে গিয়ে অামাদের হিমশিম খেতে হবে তাই জরুরিভাবে আরেকটা চুলা দরকার। শশ্মানে যদি একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব এর ব্যাবস্থা করা হয় তাহলে রাতে যেসব রোগী মারা যান তাদের সৎকার কার্য সম্পাদন করতে পারবে বলেও জানান তিনি।বিস্তারিত ভিডিওতে দেখে নিনঃ-
এই বিষয়ে কমিটির উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য কুমার রাজেন দাশগুপ্ত বলেন,আমরা মুখে সবার কাছ থেকে সব কিছু পাচ্ছি,কিন্তু বাস্তবে কিছু পাচ্ছি না। আমরা নিজেদের ব্যাক্তিগত পক্ষ থেকে এবং যার যার মতো ব্যক্তিগত ভাবে সংগ্রহ করে কাজ চালাচ্ছি। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, কমিটির উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য রানা প্রতাপ বণিকের অনুরোধে সাবেক মেয়র মঞ্জু সাহেব শশ্মানে যাওয়ার রাস্তাটা মেরামত করে দিবেন বলে অাস্বস্থ করেন এবং সংগঠনের মূখ্য উপদেষ্টা ডাক্তার যীশু দেব দাদা আজকে ডক্টর এসোসিয়েশন থেকে বেশ কিছু নিরাপত্তা সামগ্রী অনুদান হিসেবে এনেছে।
এ বিষয়ে সংগঠনের মূখ্য সচিব ডাক্তার যীশু দেব বলেন, শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত অামাদের স্বেচ্ছাসেবকরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছেন। এর পরেও গাড়ি ভাড়া,কাঠ,ধূপ,কেরোসিন,
স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য পিপিই,মাস্ক,গ্লাবস ক্রয় বাবদ অামাদের অনেক টাকা খরচ হচ্ছে যা অামরা ব্যাক্তিগত এবং বিভিন্ন মাধ্যমে কোনরকম চালিয়ে নিচ্ছি। তাই বিত্তবানদের এগিয়ে অাসার পাশাপাশি মাননীয় মেয়র মহোদয় এবং হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে এ ব্যাপারে সদয় দৃষ্টি দেওয়ার জন্য অাহ্বান জানান তিনি।