করোনা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে কি করছে ?

লেখক:ডাঃ বিদ্যুৎ বড়ুয়া
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
পরিচালক,চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল।

Health Desk : Daily local voice

News Desk : Daily local voice

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুদীপ্ত অকাশ রাজন

২০১৯ এর ডিসেম্বর ৩১ – এই মহাবিশ্বের একটি কালো দিন। এই দিনই চীনের উহান অঞ্চলে করোনা ভাইরাস এর প্রথম রোগী সনাক্ত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের মহামারী সামাল দিতে হিমশিম এই বিশ্ব। এমন কোন মানুষ নেই, যারা কিনা আতংকিত।
এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে যেটা সত্য তা হচ্ছে অনেকের ক্ষেত্রে খুব ভয়াবহ নয় কিন্তু আরো সত্য হচ্ছে কিছু মানুষ এই ভাইরাসে মারা যায়।
আসলে এই প্রশ্ন আমার মতো অনেকেরই , ভাইরাসটি কিভাবে আক্রমণ শুরু করে,কেন করে কিংবা কিছু মানুষ কিভাবে মারা যায় ?

ইনকিউবেশন টাইম শব্দটি জটিল হলেও বাংলায় যদি বলি প্রাথমিক লালনকাল বা প্রতিষ্ঠিত কাল তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। এই সময়ে ভাইরাসটি নিজেকে ধীরে ধীরে যার দেহে সংক্রমিত হয় তার দেহে প্রতিষ্ঠিত হয় ।

আমাদের শরীর বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে তৈরী। ভাইরাসটি কোষগুলোর ভিতরে প্রবেশ করে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করে।করোনাভাইরাস, যার একাডেমিক নাম সার্স-সিওভি-২, আমাদের নিশ্বাসের সাথে আমাদের দেহে প্রবেশ করে সংক্রমিত হতে পারে (আশেপাশে কেউ হাঁচি বা কাশি দিলে) বা ভাইরাস সংক্রমিত কোনো জায়গায় হাত দেয়ার পর আমাদের মুখে হাত দিলে।

ভাইরাসটি শুরুতে আমাদের গলা, শ্বাসনালীগুলো এবং ফুসফুসের কোষে আঘাত করে এবং সেসব জায়গায় করোনার বিশাল গোষ্ঠী ও উৎপাদন কারখানা তৈরি করে। পরে ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নতুন ভাইরাস ছড়িয়ে দেয় এবং আরো কোষকে আক্রান্ত করে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই সময়ে আমরা অসুস্থ হবো না এবং কিছু মানুষের মধ্যে হয়তো উপসর্গও দেখা যাবে না।

ভাইরাসের এই ঘুমন্ত সময় বা ইনকিউবেশন সময় – প্রথম সংক্রমণ এবং উপসর্গ দেখা দেয়ার মধ্যবর্তী সময় – স্থায়িত্ব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয় , কিন্তু গড়ে তা সর্বোচ্চ পাঁচদিন। অনেকের জন্য এই অসুখটা গো-বেচারা টাইপের। কেননা গড়ে ৮০% মানুষের ক্ষেত্রে প্রধান উপসর্গ কাশি ও জ্বর। পাশাপাশি ব্যাথা যা শরীর,মাথা ও গলায় হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।প্রত্যেক মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার একটা ক্ষমতা থাকে। যখন ভাইরাস শরীরে সংক্রমিত হয় তখন রোগ প্রতিরোধক কোষগুলো প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসাবে শরীরে জ্বর এর লক্ষণ প্রকাশ করে । রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা ভাইরাসটিকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বাকি শরীরে সাইটোকাইনস নামক কেমিক্যাল পাঠিয়ে শরীরে কিছু একটা সমস্যা তা বুঝিয়ে দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে শরীরে ব্যথা ও জ্বরের উপসর্গ দেখা দেয়। শুকনা কাশি প্রথমেই দেখা যায় করোনার কারণে। কোষগুলো ভাইরাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ায় অস্বস্তিতে পড়ার কারণে সম্ভবত শুকনো কাশি হয়ে থাকে।তবে অনেকের কাশির সাথেই একটা পর্যায়ে থুতু বা কফ বের হওয়া শুরু হয় যার মধ্যে ভাইরাসের প্রভাবে মৃত ফুসফুসের কোষগুলোও থাকে ।এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সম্পূর্ন বিশ্রাম, অধিক তরল পান করা এবং প্যারাসিটামল খাওয়া জরুরী । কিন্তু এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন হয় না।সাধারণত এই পর্যায়টি সাত দিনের মত স্থায়ী হয়। অধিকাংশ মানুষই এই পর্যায়ের মধ্যেই ভালো হয়ে যায় কারণ ততদিনে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের সাথে লড়াই করে সেটিকে প্রতিহত করে ফেলে।
তবে গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসের আরো ক্ষতিকর কিছু উপসর্গ তৈরি হয়। ইদানিং গবেষণায় দেখা যাচ্ছে করোনা উপসর্গের মধ্যে চোখের কনজাংভাইটিস,খাবারে অরুচি ও স্বাদহীনতা এবং সর্দিও লাগতে পারে।
বয়স্ক বিশেষ করে যাদের ডায়বেটিস,হৃদরোগ সহ অন্যরোগে আক্রান্ত আছেন তাদের এই সব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ভয় নয় আতংক নয়। পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব থেকেও সরে আসবেন না। ঘরে থাকা বা হাইজিন মেনে চলার মতোই এখন প্রত্যেকের দায়িত্ব পাশের মানুষটিকেও সতর্ক করা। কাউকে নিজের দায়িত্বে গাফিলতি করতে দেখলে রুখে দাঁড়ান। যাঁরা জরুরি পরিসেবার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা রাস্তায় বেরলে কোথাও কোনও জমায়েত দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করুন। ‘আমার কী’ বলে এড়িয়ে যাবেন না। মনে রাখবেন, এক্ষেত্রে ‘আপনার-আমার’ বলে কোনও কথা নেই। এখনও পর্যন্ত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন খুব সীমিত আকারে হয়েছে। সজাগ সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই করোনা প্রতিরোধ করতে হবে প্রাথমিকভাবে।


টিপস: দুই ঘন্টা পর পর হাত ধোবেন ২০ সেকেন্ড করে।


লেখক
ডা, বিদ্যুৎ বড়ুয়া
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।