
ছাত্র রাজনীতিকে বলা হয় নেতৃত্ব তৈরির বাতিঘর বা আঁতুড়ঘর।
বাংলাদেশে ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক অর্জন। সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন সহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের দৃশ্যমান সক্রিয় ভূমিকা অনস্বীকার্য।
যদিও আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির যেসব অর্জন আছে, তা বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই তবে বহির্বিশ্বের দিকে যদি তাকিয়ে দেখি, তাহলে সেখানেও আমরা ছাত্রসমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখতে পাব।
কিন্তু সময় এখন উল্টো স্রোতে হাঁটছে, ছাত্র রাজনীতির সেই উজ্জ্বল সুসময় এখন আর নেই, এখন দেশে একটা বিপদজনক রাজনীতিবিমুখ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, যাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই তারা স্মার্টলি জবাব দেয়, “আমি রাজনীতি পছন্দ করি না”। শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, সব বয়সের মানুষের মধ্যেই রাজনীতি নিয়ে এক ধরনের অনীহা বা নেতিবাচক ধারনা কাজ করে৷
সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে এক ধরনের ভয় পায়, তাই তারা দূরে থাকেন। এখন আর কেউ চান না তার সন্তান ছাত্ররাজনীতি করুক । আর আমাদের মন্ত্রী এমপি বা নেতা-আমলারা তো তাদের সন্তানদের বিদেশেই পড়ান। তাই দেশ, রাজনীতি বা ছাত্ররাজনীতি গোল্লায় গেলেও তাদের যেন কিছু যায় আসে না । এই রাজনীতি বিমুখ প্রবণতা দেশ ও জাতির জন্য সত্যিই অনেক বিপদজনক ।
এই প্রজন্ম শুনতে চায়না, বলতে চায়না, করতে চায়না, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়না, এদের ভিতরে ভিতরে দাসত্ব তৈরি হচ্ছে, এরা উচ্চ শিক্ষিতের পাশাপাশি অতি শিক্ষিত হবে, সচিব হবে বা আমলা হবে এটুকুনই তাদের স্বপ্ন, এতেই তারা খুশি, কারন হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করার অগাধ সুযোগ একমাত্র এই আমলা যন্ত্রেই আছে। অথবা এসব কথিত মেধাবীরা বিদেশে সেটেল্ড হওয়ার স্বপ্ন দেখে, এদেশের ধুলাবালি আর ইনসিকিউরড জীবনযাপন তাদের কোন কালেই ভালো লাগেনি, তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছে।
এই দাস আর মেরুদণ্ডহীন স্বার্থপর জনগোষ্ঠী নিয়ে এদেশ আদৌ কতটা আগাতে পারবে তা নিয়ে আমি সত্যিই সন্দিহান। তারা জানেনা চালের মূল্য কত, আটার মূল্য কত, আলুর মূল্য কত বা সয়াবিন তেলের মূল্য। এসবে এদের কিছু যায় আসেনা, তারা বিভোর বিসিএস নিয়ে, তারা মগ্ন উন্নত দেশে সেটেল্ড হওয়ার স্বপ্নে।
তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে তুমুল রাজনীতিপ্রিয় একজন মানুষ, রাজনীতিকে অসম্ভব ভালবাসি, আমি অন্তর দিয়ে অনুভব করি কত বেশি রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা। এদেশের চাল ডাল নুনের মূল্য থেকে শুরু করে সবকিছুই রাজনীতিবিদেরাই নিয়ন্ত্রন করেন। রাজনীতির বাহিরে কিছু চিন্তাও করতে পারিনা, চিন্তা করার সুযোগও আসলে নেই।
বর্তমান রাজনীতিতে অনেক সমস্যা আছে জানি, তাও আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতিই আমাদের শেষ ভরসা৷ আমরা যত সমালোচনাই করিনা কেন, রাজনীতিবিদরাই কিন্তু দেশ চালান, দেশ ও জনগণের নীতিনির্ধারণ করেন৷
আমি এও বিশ্বাস করি সবচেয়ে খারাপ গণতন্ত্রও অন্য যে কোনো শাসন ব্যবস্থার চেয়ে অনেক ভালো।
রাজনীতি নোংরা নয়, রাজনীতি খারাপও নয়, ভদ্র লোকেরা রাজনীতি বিমুখ হচ্ছে বলে বা দেশপ্রেমি মানুষ গুলো রাজনীতি থেকে দূরে থাকছে বলেই রাজনীতি আজ খারাপ ও নোংরা মানুষদের দখলে চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বাংলাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে এদেশে গণমানুষের এই নেতৃত্ব তৈরি হতো ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই। বর্তমানে ছাত্ররাজনীতিতে মানসম্মত বা গুনগত নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছেনা বলেই জাতীয় রাজনীতিতে এর দারুণ প্রভাব পড়ছে। এই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে সরকারি আমলা ও কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা। একসময় ছাত্ররাজনীতি করে ছাত্র ও জনবান্ধব বিভিন্ন ইস্যুতে দাবী আদায়ের জন্য রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে, জেল জুলুম খেটে, জনমানুষের সমর্থন ও ভালবাসা নিয়ে নিঃস্বার্থ সাদামাটা দেশপ্রেমী মানুষ গুলোই তিলে তিলে জননেতা হয়ে উঠতো, কিন্তু এখন জননেতা হওয়ার জন্য এসবের কিছুই লাগেনা।
সরকারী সাবেক বড় আমলা, কোন বাহিনীর সাবেক হর্তাকর্তা অথবা বড় ব্যবসায়ী বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টরা এসে হুট করেই বিভিন্ন দলে নেতা বনে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনীতির জন্য অশনী সংকেত ও বিপদজনক হুশিয়ারি।
বর্তমান রাজনীতি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক দৈন্যতা।
ছাত্রনেতাদের মধ্যে গুনগত পরিবর্তন না আসলে এদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি আর রাজনৈতিক নেতাদের হাতে থাকবেনা। তখন আমলা, সচিব, বিভিন্ন বাহিনী, ব্যবসায়ী আর বিদেশে পালিত রাজপুত্ররাই হুট করে এদেশে এসে দেশ চালাবে, বাংলা ইংরেজি মিশ্রিত আধুনিক ভাষা আমাদের গেলাবে। হাইভ্রীড আর সুযোগ সন্ধানীদের জয়জয়কার হবে চতুর্দিকে।
যদিও অনেক দেরী হয়ে গেছে তবে এখনো শেষ হয়ে যায়নি, সময় আছে এখনো। ছাত্র রাজনীতিকে ঢেলে সাজান, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করুন, সময় মতো ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র সংসদের কমিটি গুলো দিন, তাদের গলা চেপে না ধরে কথা বলার সুযোগ দিন। মেধাবীদের রাজনীতি করতে উৎসাহী করুন, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ছাত্রসংগঠনের কর্মকাণ্ড কমিয়ে আনুন, কর্মকাণ্ড থাকলেও তা যেন ছাত্র ও জনবান্ধব হয় সেটা নিশ্চিত করুন।
রাজনৈতিক নেতা বানানোর আগে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখুন, স্বাধীনতা বিরোধী, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা, অথবা ক্রিমিনাল মন মানসিকতা রাখে এমন পরিবারের কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার আগে ভাবুন।
আমাদের শত বছরের রাজনৈতিক, আন্দোলন সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা বার বার তোলে আনুন, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন আগামী প্রজন্মের কাছে বেশি বেশি পৌঁছে দিন। রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, যেভাবেই হোক একটা গুনগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন, ছাত্র রাজনীতির গুনগত পরিবর্তন আসলে জাতীয় নেতৃত্বের মান বৃদ্ধি পাবে, তাহলেই দেখবেন সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ।
লেখকঃ এডভোকেট এস এম রাশেদ চৌধুরী
সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সাবেক সদস্য, কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।।






















